• 01869038567
  • shariatpurpost.com@gmail.com
  • ভেদরগঞ্জ, শরীয়তপুর।

আজ সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আলম হাওলাদার এর মৃতুবার্ষিকী

শরীয়তপুরের যে কজন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারী কর্মকর্তা তার কর্মজীবনের সাথে জনসেবাকে আদর্শ হিসাবে নিয়ে কাজ করে গেছেন ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আলম হাওলাদার তাদের অন্যতম। এ এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ও দারিদ্র বিমোচনে তার অবদান অপরিসীম।
ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আলম শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলার ডামুড্যা গ্রামে ১৯৪০ সালের ১লা মার্চ জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা সুলতান আলম হাওলাদার একজন সরকারী চাকুরীজীবি ছিলেন। সরকারী চাকুরী শেষে স্বাধীনতার পরবর্তীতে তিনি ডামুড্যা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাদের পরিবারটি একটি বুনেদী মুসলিম পরিবার হিসাবে এলাকায় পরিচিত।অল্প বয়সেই তিনি তার মাকে হারান।
ফারুক আলম শৈশবে নিজ গ্রামে প্রাইমারী শিক্ষা লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। ঢাকাতে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান-সুইডিস ইন্ডাষ্টিয়াল টিম্বার টেকনোলজীতে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে মিশন ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করেন।১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে সুইডেন গমন করেন। ১৯৭০ সালে সুইডেনের এরিখ ডালবার্গ কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং হতে ইঞ্জিনিয়ারিং এ উচ্চ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি হয়ে উঠেন পূর প্রকৌশলবিদ ও কাঠ প্রযুক্তিবিদ।
তিনি ১৯৭০ সালে স্বদেশ ফিরে টিম্বার টেকনোলজিষ্ট হিসাবে বাংলাদেশ বনশিল্প সংস্থায় সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে কাজে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে তাকে চাকুরী থেকে বর্হিস্কার করা হয়।
১৯৭১ সাল তার জীবনের এক উল্লেখযোগ্য বছর। তিনি সুইডেনে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলেন। সুইডেনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য গঠিত একশন কমিটির সাধারন সম্পাদক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের গনহত্যার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ব বাসীর দৃষ্টি আকর্ষন করেন। তার এ সংবাদ সম্মেলেনের বিষয়টি সুইডেনের পত্র-পত্রিকা ও গনমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। সুইডেন সরকার স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানকে গানবোট সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। স্বাধীনতা লাভের পর সুইডেন কর্তৃক বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানের ব্যপারেও ফারুক আলম গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি বিএফআইডিসির একটি প্রকল্পে (কাপ্তাই প্রজেক্ট) পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন।১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এখানে কাজ করেন। এ সময়ে এ প্রকল্পে অত্র এলাকার অনেক যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।
১৯৭৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনৈতিকভাবে একটি দলগঠনের সময় ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আলমকে রাজনীতিতে যোগদানের আহবান জানান। জনাব ফারুক আলম সরকারী চাকুরী ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং জাতীয়তাবাদী দলের ষ্টান্ডিং কমিটির সদস্য হিসাবে কাজ করেন।
১৯৭৯ সালে তিনি শরীয়তপুর-৩ (ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ, গোসাইরহাট) আসনে স্বতন্ত্র পার্থী হিসাবে নির্বাচন করেন।
১৯৮০ সালের দিকে তিনি ঢাকা সোনারগাও হোটেল প্রকল্পে ডেপুটি চীফ ইন্জিনিয়ার হিসাবে যোগদান করেন। কয়েক বছর তিনি এ পদে কাজ করেন।
১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসাবে শরীয়তপুর ৩ আসনের এমপি নির্বাচিত নন। এ সংসদ দুই বছর স্থায়ী ছিল। সংসদ সদস্য হিসাবে এলাকার উন্নয়নে মূল্যবান অবদান রাখেন।
১৯৯১ সালে তিনি অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এর চেয়ারম্যান হিসাবে যোগদান করেন। নৌযোগাযোগের সুবিধার জন্য তিনি অনেক গুলি ফেরীর ব্যবস্থা করেন। শরীয়তবাসীর সুবিধার্থে ঢাকা-খুলনা ষ্টীমারের একটি ঘাট হিসাবে পট্টি
ঘাটের ব্যবস্থা করে শরীয়তবাসীর যোগাযোগের সুবিধা করে দেন। কয়েক বছর কৃতিত্বের সাথে কাজ করে তিনি অবসর গ্রহন করেন।
ঢাকার দোহার থানার খান বাহাদুর আবদুল খালেকের ছোট মেয়ে লায়লা খানমকে তিনি ১৯৭৪ সালে বিয়ে করেন। মিসেস আলম বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর পরিচালনা বোর্ডের সদস্যা ছিলেন এবং গুলশান বিএনপির মহিলা শাখার সভানেত্রী ছিলেন। সাবেক নৌবাহিনী প্রধান কমান্ডার নূরুল হক তার বড় ভাই। লায়লা খানম ২০০৬ সালে মারা যান। একমাত্র সন্তান ফাহিম আলম উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। বর্তমানে আমেরিকার ফ্লোরিডায় একটি কোম্পানীর চেয়ারম্যান হিসাবে কর্মরত আছেন। ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আলমের চাচাত বোন সামছুন নাহার ঐতিহ্যবাহী রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুরের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তার এক চাচা বরিশাল বি.এম কলেজের অধ্যাপক ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধে বরিশালে শহীদ হন।
এলাকার যুবকদের কর্মসংস্থান ও দারিদ্রমোচন ফারুক আলমের ব্রত ছিল। যেখানেই তিনি চাকুরী করেছেন এলাকার ছেলেদের চাকুরী দিয়েছেন। এলাকায় এ সংখ্যা প্রচুর। তিনি সামান্য অর্থের বিনিময়ে অনেক যুবককে বিদেশে পাঠিয়েছেন।
চাকুরী জীবনের শেষে এবং স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি অনেকটা নিঃসংগ জীবন যাপন করতেন। আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ থাকা সত্বেও তিনি দেশের মায়ায় আমেরিকায় স্থায়ী বসবাসের সিদ্ধান্ত নেননি।
দেশের প্রথম দিককার একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং সাংসদ হয়েও তার জীবনযাপনে ছিলেন সবার বন্ধুর মতো। শেষ বয়সে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে দাওয়াত পেলে তিনি যোগদান করতেন।
তিনি ছিলেন দেশের উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং তার নিজস্ব এলাকার সমাজ ব্যবস্থাতে সকলের সম্মানজনক সহ অবস্থান, এলাকার উন্নয়ন তার কাম্য ছিল।
গত বছরের ২৪শে মে করোনা রোগে এ সাবেক সাংসদ জনাব ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আলম হাওলাদার ইন্তেকাল করেন। মরহুমকে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবি গোরস্থানে দাফন করা হয়।

লেখকঃ মো. মজিবর রহমান, দারুল আমান।

আপনার মন্তব্য লিখুন